অল্পের জন্য বেঁচে গেলো শখের ফোনটা

ঢাকার শহরের মধ্যে মোহাম্মদপুর প্রিয় একটা জায়গা। প্রিয় কিছু মানুষের বসবাস আর অধিক যাতায়াতে পরিচিতির কারণে, এমনটা সবার বেলায় ই হয়। সিলেট থেকে নির্ধারিত পাঁচ ঘন্টার জার্নির কথা বলে, সাড়ে সাত ঘন্টায় বাস পৌঁছালো ঢাকা।বি.আর.টি.সি. এর দ্বিতল বাস ধরে মহাখালী থেকে মোহাম্মদপুর আসছি, ঝুলে ঝুলে বেহালে! সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা, পিক আওয়ার অফিস শেষে ঘরে ফেরার তাড়া সবার। তাই বাসে দাঁড়ানোর জায়গাটুকুই যে পেয়েছি ভাগ্যের ব্যাপার।

আড়ং এর মোড় আসার পর মহিলা ও প্রতিবন্ধীদের জন্যে বাসের সংরক্ষিত ১৩ টি আসনের মধ্যে একটি আসন খালি হলো। খালি সিটের পাশেই দাঁড়ানো আছি আমি, সংরক্ষিত আসনে একটা মেয়ের পাশে বসতে ইতস্তত বোধ করছি, কারণ মেয়েটাকে ডিঙিয়ে ভেতরে বসতে হবে অথবা উনাকে বলতে হবে একটু ভেতরে চাপেন, বসবো! এইভাবে ইতস্তত ভাব নিয়েই দাঁড়িয়ে আছি মিনিট পাঁচেক। ভদ্র মহিলাই (মেয়ে) আমাকে বলছেন- দাঁড়িয়ে কেনো? বসুন এখানে! উনি উঠে আমাকে জানালার পাশে বসার সুযোগ দিলেন কারণ একটু পরেই উনি নেমে যাবেন। আমিতো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি মার্কা অনুভূতি নিয়ে আসন গাড়লাম, বাসে জানালা পাশের সিট সবারই প্রিয়। পকেট থেকে মুঠোফোন টা বের করে বরাবরের মতো কানে ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনা শুরু।

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক গুলো আজকাল যোগাযোগের বিশাল একটা মাধ্যম হিসেবে স্থান দখল করে নিয়েছে। আর সাধের স্মার্টফোনের কথা আর নাইবা বললাম। ডাটা (ইন্টারনেট) চালু করে দেখলাম অনেকগুলো ম্যাসেজ এসেছে বন্ধুদের, সবাই চাকুরীর পরীক্ষা দিতে এসেছে, তাই কে কোথায় আছে লোকেশন জানতে চাচ্ছে। আসাদগেট ছেড়ে টাউনহল মসজিদ রোড এসে বাস থেমে আছে অনেকক্ষণ। মনে মনে ভাবছি ঢাকা শহরের কিছু পাবলিক বাসের মধ্যেই অভার ফোনে অফিস সারে বোধয়, পাবলিক প্লেসে এতকথা কিভাবে বলে লোক গুলো? বিরক্তি নিয়ে একটার পর একটা গান পরিবর্তন করছি। রোডের মাঝখানে আমাদের বাস ঘেঁষে কে জানি হেটে আসছে, সামনের লুকিং গ্লাসে এক পলক দেখলাম।

বাসের চাকা ঘুরতেই কে জানি আমার হাতে থাকা ফোনে ঝাপটা দিয়েছে! মস্তিষ্ক জানান দিলো সেই লোকটা, যে একটু আগে পায়চারি করছিলো। আমিও হাতের ফোনটা আমার পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে তৎক্ষণাৎ ধমকি দিয়ে ফিরতি ঝাপটা দিলাম বেচারার হাতটা ধরার জন্যে। সৌভাগ্যক্রমে তার, দুর্ভাগ্য আমার হাতটা ধরতে পারিনি! পেছন থেকে লোক চেঁচিয়ে জিগ্যেস করলেন- ফোনটা কি নিতে পেরেছে!!? (জিগ্যেস ভাব খানা এমনঃ ফোনটা নিলে উনি খুশি হতেন) বললাম- না! হাতটা ধরতে পারিনি, নইলে ঝুলিয়ে রাখতাম কিছুক্ষণ।

একইসাথে দুটা বিষয় কাজ করছে মনে- ছিনতাইকারী ফসকে যাওয়ার আফসোস এবং ফোন টা না হারানোর আনন্দ। কাউকে যদি জিগ্যেস করেন- মনে করুন আপনি বিশা হাজার টাকা আর বিশ হাজার টাকার একটা ফোন হারিয়েছেন। কোনটার জন্যে আপনার আফসোস বা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন মনে করেন? নির্দ্বিধায় উত্তর দেবে ফোনের জন্যে।

যদি ফোনটা হারানো যেতো যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতাম-

→সবার কাছ থেকে যোগাযোগের দিক দিয়ে সাময়িক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতাম। (“এখান থেকে ফোন করা যায়” এই সাইনবোর্ড বাংলাদেশ থেকে বিলীন) এখন আর পরিবারের ফোন নাম্বার ব্যাতিত কেউ দুনিয়ার নাম্বার মুখস্থ রাখেনা।

→গুগল ম্যাপ দেখে দেখে ঢাকায় মাস্তানি করে ঘুরাঘুরি বন্ধ হয়ে যেতো।

→বিশেষ বিশেষ নোট, ইমেইলিং, মোবাইল ব্যাংকিং এরকম দরকারি অনেক কিছুর জন্যে সাময়িক ভোগান্তিতে পড়তে হতো। সাথে অলস একা সময় কাটানোর কথা বলার অপেক্ষা রাখেন।

কিছু কথাঃ
আমরা যারা দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকে ঢাকা শহরে আসি, স্বাভাবিক ভাবেই এ অনেক বিষয় সম্পর্কে অবগত থাকিনা। কারণ ঢাকার মতো আপনার আমার শহরে হয়তো ছিনতাইয়ের সাথে পরিচিত না। নিচের এ কথা গুলো হয়তো আপনার একটু উপকারে আসতে পারে।

** ঢাকা শহরে বাসে জানালার পাশে বসে মোবাইল ফোন অপারেট করবেন না। যদি আমার মতো ঘাউড়া হোন তাইলে কইরেন। কারণ ছিনতাইকারী কে ফিরতি ঝাপটা দেওয়ার হিতায়িত জ্ঞান সবার থাকেনা। (মজার বিষয় হচ্ছে এই লিখাটাও বাসে জানালার পাশে বসে লিখছি)

** আপনি শখের বসে সুন্দর একটা দৃশ্য ধারণ করার জন্যে পকেট/ব্যাগ থেকে ফোন টা নিয়ে মোবাইল গ্রাফি করতেই পারেন। কিন্তু এটাও বিপদজনক, আপনার ফোনটা নেওয়ার জন্যে দূর থেকে ঢিল মেরে কিবা কোনো অস্ত্র ছুড়ে মারতে পারে। চোখ কান খোলা রেখে হাত এবং ফোনের মায়া ছাড়তে পারলে ফটোগ্রাফি করতে পারেন।

** জানালার পাশে সিটে বেখেয়ালি কিবা না ঘুমানোই ভালো।

** যাত্রাপথে আপনার মালামাল এবং নিজের খেয়াল রাখুন।

** অপরিচিত লোকের দেয়া কিছু খাওয়া যেতে পারে যদি সে আর আপনি যদি একই খাবার একসাথে খান।

একটুখানি অসাবধানতা আপনাকে বিপদের মুখে ফেলে দিতে পারে। শুভ হউক আপনার আমার প্রতিটি যাত্রা দূরের কিবা কাছের। সুন্দর এবং সুস্থ্যভাবে ফিরে যাই আপনজনের কাছে।

MOHiN rahman Mahi

পানির দাম

ফিরোজের মন খারাপ। অনেক বেশিই খারাপ। তার বউ ২ দিন ধরে প্রসব বেদনায় কষ্ট পাচ্ছে। অবস্থা ভালো না। আরও ১২ ঘণ্টা আগেই তাকে হাসপাতালে নেয়া উচিত ছিল। কিন্ত হাসপাতাল এখান থেকে অনেক দূরের পথ। পথ বলতে কিছুটা ভ্যান গাড়িতে, কিছুটা হেঁটে, বাকি পথ লঞ্চে। প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ। আয়সাকে হাসপাতালে না নেবার এটা একটা কারণ, তার চেয়েও বড় কারণ আয়সার বাবা মা চাননি তাদের মেয়ে হাসপাতালের খোলামেলা পরিবেশে সন্তান প্রসব করুক। আর ফিরোজের মারও বৌমাকে হাসপাতালে পাঠাবার ব্যপারে একদম সায় ছিল না। এই ফুলপুর গ্রামের মানুষগুলি সহজ সরল, ধর্মভীরু, আর অনেক হাসিখুশি, মেয়েরা পর্দাশীল। গ্রামের প্রায় ১০০ ভাগ মানুষ নামাজি। এই গ্রামের মানুষেরা সবাই সবার অতি আপনজন। এখানকার ছেলেমেয়েরা বেশির ভাগই নিজ গ্রামের ছেলেমেয়েদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আয়সা ফিরোজের আপন মেঝো চাচার মেয়ে। তারা একই বাড়ির ছেলেমেয়ে। প্রায় ২ বছর হল ওদের বিয়ে হয়েছে। ফিরোজ মিয়ার বয়স ২৩, শ্যামল, সুঠাম দেহের শক্তিশালী একজন যুবক। গাল ভরা কালো দাড়ি। কোনদিন গালে ব্লেড লাগায়নি। আশা আছে সারা জীবন সেভ না করে মরবে এবং বেহেস্তে বসে লায়লি-মজনুর বিবাহ দেখবে।  সে ফুলপুর বাজারে ছোট একটা মনিহারি দোকান চালিয়ে বেশ ভালো ভাবেই জীবিকা নির্বাহ করে। আগে তার বাবা চালাত। ৫ বছর আগে লঞ্চ ডুবিতে তিনি মারা যান। এখন সে চালায়।

বাজারের মসজিদ থেকে মাগরিবের নামাজ আদায় করে এখন দোকানে বসে ক্যাশ মিলাচ্ছে ফিরোজ। সারাক্ষণই আয়সা ও তার অনাগত সন্তানের জন্য দোয়া করে চলেছে সে। আয়সার কিছু হলে সেও বাঁচবে না। সে আয়সাকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসে। তার বউ এর বয়স মাত্র ১৭বছর। এত অল্প বয়সে আয়সা সন্তান নিতে একটুও আগ্রহী ছিলনা। ফিরোজের জোরাজোরিতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে রাজি হয়েছে। এখন সে আত্মগ্লানিতে ভুগছে,-আমার জন্যই আয়সা আজ মরতে বসেছে।

এখন বেচাকেনার সময়। দোকানে বেশ কিছু কাস্টমার ভিড় করেছে। সে বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে দোকান বন্ধ করতে লাগলো। সে এখনি দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে যাবে। দুই দিন ধরে দোকানে বসেনা বললেই চলে। আয়সার পাশে থাকাটা এই সময় সবথেকে বেশি জরুরি। দোকানের শেষ দরজাটা আটকাতে যাবে ঠিক সেই সময় ফিরোজের সামনে একজন মানুষ এসে দাঁড়ালো। দাঁড়ী-গোঁফ আর চুলের জঙ্গলে ঢাকা সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষ। পরনে ময়লা একটা সাদা হাফ সার্ট, কালো প্যান্ট। খালি পা।

বয়স ৩০ হতে পারে আবার ৫০ হওয়ার সম্ভবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না। হাড্ডিসার মানুষটার শরীরে পোশাকগুলি ঢল-ঢল করছে। নতুন কোন পাগল হবে হয়তো, ভাবলো ফিরোজ। ফুলপুর বাজারে মাঝে মাঝেই নতুন নতুন পাগলের আমদানি হয়।

-পানি বিক্রি করেন?

লোকটার কথায় অবাক হল ফিরোজ। সে একটা কাঁচের গ্লাস হাতে নিতে নিতে বললো

-পানি বিক্রি করিনা, আপনি যত খুশি এমনিই খান।

লোকটা মাথা নাড়ল।

-মাগনা কিছু খাইনা।

ফিরোজ বেশ বিরক্ত হচ্ছে।

–আরে মিয়া, বললাম না আমাদের বাজারে পানি বিক্রি হয় না।

সে এক গ্লাস পানি ভরে লোকটার দিকে এগিয়ে দিল

-এই যে নিন পানি খান।

লোকটা পানির গ্লাস নিলনা, ঠায় দাড়িয়ে রইলো। বিরক্ত স্বরে ফিরোজ বললো

-কি হল? পানি খাবেন না?”

লোকটা মাথা নেড়ে বললো

-একবার বলেছিতো মাগনা কিচ্ছু খাইনা। এই ১ গ্লাস পানির দাম কত বলেন?

ফিরোজ প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছে, রাগও হচ্ছে খুব। অন্য সময় হলে লোকটাকে কষে ধমক লাগাত সে। কিন্তু এখন তার মনটা দুঃখ ভারাক্রান্ত আর অনেক নরম। সে নরম স্বরে বললো

-ভাই, মাগনা খেতে হবেনা, আগে পানি খান, তারপর যা মন চায় তাই দিয়েন।

এবার লোকটা পানির গ্লাস হাতে নিলো। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে পানির দিকে তাকিয়ে রইলো লোকটা। ময়লা আছে কিনা খুঁজছে? ফিরোজ এবার রাগত স্বরে বললো

-আরে ভাই কি দেখেন, একটু আগেই কল থেকে টাটকা পানি তুলে এনেছি। খান, একদম ফ্রেস পানি, কোন ময়লা নেই।

লোকটি ফিরোজের কথায় কোন সারা দিলনা, পানির দিকে তাকিয়েই রইল। ফিরোজ মনে মনে বিরক্ত হলেও আর কিছু বললো না। প্রায় ৩/৪ মিনিট পর লোকটা পানির গ্লাসে ঠোঁট ছোঁয়াল। ঢক ঢক করে অর্ধেকের বেশি পানি খেয়ে ফেললো সে। প্রায় আধা ভরা গ্লাসটা ফিরোজের দিকে বাড়িয়ে দিলো

-এই নিন আপনার পানির দাম। এর থেকে কিছুটা আপনার স্ত্রীকে খাইয়ে দিবেন, বাকিটুকু তার পেটে ঢেলে দিবেন।

গ্লাসটা ফিরোজের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না লোকটা, দ্রুত আড়ালে মিলিয়ে গেলো। গ্লাস হাতে হতভম্বের মত কিছুটা সময় দাড়িয়ে রইলো ফিরোজ। মানুষটার খোঁজে কয়েকবার এদিক-ওদিক তাকাল সে, কিন্তু কোথাও লোকটির চিহ্ন মাত্র নেই। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। বুক ধর-ফর করছে, শরীরে কাঁপন অনুভব করছে ফিরোজ। তার মন বলছে, যা ঘটেছে সেটা কোন স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। সে পরম মমতায় পানির গ্লাসটায় বার বার চুমু খেতে লাগলো। তার বিশ্বাস এই পানি আয়সাকে খাওয়ালেই, সে ভাল হয়ে যাবে। সে তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে বাড়ীর দিকে হাঁটতে লাগলো। পা চালিয়ে গেলে ২০ মিনিটের পথ। সে যখন অর্ধেক রাস্তা পার হয়েছে দেখলো, তার শ্যালক নাসির ছুটতে ছুটতে এদিকেই আসছে। ধক করে ওঠলো কলিজাটা, সব কি শেষ? হাঁপাতে হাঁপাতে নাসির বললো

-দুলাভাই, তাড়াতাড়ি বাইত লন, বুবু কেমন জানি করতাছে।

বলতে বলতেই কেঁদে ফেললো সে। নাসিরকে নিয়ে ফিরোজ এবার রুদ্ধশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটতে শুরু করলো।

ফিরোজদের বাড়ি ভরা মানুষ। মধ্য বয়সী কয়েকজন মহিলা পূর্ব পাশের বারান্দায় বসে কোরআন-মজিদ পাঠ করছেন। পুরুষেরা অসহায়ের মত এদিক-সেদিক বসে আছেন। আজ ভরা পূর্ণিমা। চারদিক আলোকিত করে এই সন্ধ্যা রাতেই পূর্ব আকাশে বিশাল চাঁদ উঠেছে। এই পাগল করা জ্যোৎস্নায় এ বাড়ীর প্রতিটা মানুষকে কেমন বিষণ্ণ আর মলিন দেখাচ্ছে। একটা ঘর থেকে ক্ষীণ স্বরে কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। আয়সার মা তিনি। সে আজ সকাল থেকেই মেয়ের জন্য শুধু কেঁদেই চলেছেন। অনেকেই তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কিছুতেই তার কান্না থামানো যাচ্ছে না। সে তার মেয়ে আয়সাকে নিয়ে গত রাতে ভীষণ খারাপ একটা স্বপ্ন দেখেছে। শেষ রাতের দিকে চোখটা একটু লেগে এসেছিলো, তখন সে স্বপ্নটা দেখেছে। একটা মড়ার খাটের উপর সাদা কাফনে মোড়ানো আয়সার লাশ শুইয়ে রাখা হয়েছে, পাশে আর একটা ছোট মানুষের লাশ, সেটাও সাদা কাফনে ঢাকা। কেঁদে ঘুম ভেঙ্গেছে তার, সেই কান্না এখনও থামেনি।

জ্যোৎস্নার জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে বিদ্যুৎ বিহীন ছবির মত এই ছোট্ট গ্রামটা। এই মুহূর্তে গ্রামের প্রতিটা বাড়ী মানুষ শূন্য বলা যায়। সবাই বসে আছে আয়সাদের বাড়ী। গ্রামের সবার চোখের মণি আয়সা। নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সবাই আয়সাকে অনেক ভালবাসে। আবার সম্মানও করে। আয়সা মানুষটা ছোট হলে কি হবে, ওর কথা বার্তা, চাল-চলন, ব্যক্তিত্ব বড় মানুষদেরও হার মানায়। এই গ্রামে এমন বাড়ী কমই আছে, যারা আয়সার দ্বারা কোন না কোন ভাবে উপকৃত হয়নি। কারো অসুখ হলে, তার সেবায় নিজেকে উজার করে দিবে আয়সা। কারো ঘরে খাবার নেই, নিজে চাল ডাল কিনে নিয়ে হাজির। প্রতিবেশীদের মাঝে ঝগড়া লেগেছে, আয়সা গিয়ে হাজির। ঝগড়া বন্ধ। গ্রামে কারো বিয়ে, সে গিয়ে হাসি আনন্দে পুরো বিয়ে বাড়ী মাতিয়ে তুলবে। এরকম একজন মানুষের বিপদে, মানুষ কি ঘরে বসে থাকতে পারে?

আয়সা সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া-লেখা করেছে। তার ইচ্ছা ছিল, অনেক পড়া লেখা করবে। বড় একজন উকিল হবে। গরিব, অসহায় মানুষদের বিনা পয়সায় ন্যায় পাইয়ে দেবে। কিন্তু তার কোন কথাই বাপ-মা কানে তুলল না, এক প্রকার জোর করেই চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলো। অবশ্য ফিরোজকে সে খুবই পছন্দ করতো। মনে মনে ভালোও বাসত। আর ফিরোজতো ওর জন্য পুরাই পাগল। বিয়ের পর আর স্কুলে যায়নি আয়সা। ফিরোজ যেতে বলেছে, তবুও যায়নি। কি করে যাবে, সে নিজে ছিল বাল্য-বিবাহের বিরুদ্ধে। কি করে স্যারদের, সহপাঠীদের মুখ দেখাবে?

আয়সা তার ঘরে, মেঝেতে পাটির উপর শুয়ে আছে। অচেতন। সুন্দর মুখটা ব্যাথায় নীল হয়ে গেছে। তাকে ঘিরে বসে আছে এই এলাকার সব থেকে অভিজ্ঞ ধাত্রী নবিরন খালা এবং আরও দুইজন ধাত্রী। আয়সার দাদী এবং নানীও পাশে বসে আছে। সবারই মুখ মলিন আর পাথরের মত থমথমে। নবিরন খালা এবং এ ঘরের বাকি সবাই প্রসব-কালীন ব্যপারে খুবই অভিজ্ঞ। তারা বুঝতে পারছেন, এখন আর কারোরই কিছু করার নেই। যে কোন সময় সব শেষ হয়ে যাবে। অনেকক্ষণ হল আয়সার সমস্ত নড়া-চরা বন্ধ হয়ে গেছে। শ্বাস নিচ্ছে অনেক সময় নিয়ে। তার পেটের সন্তানও কিছুক্ষণ হল সাড়া দিচ্ছে না। প্রাণ রসে ভরপুর কিশোরী একজন বধু, দশ মাসের সন্তান পেটে মরতে বসেছে। দুই দিন ধরে নরক যন্ত্রণা ভোগ করছে মেয়েটা। যেদিন ব্যাথা উঠেছে, সেদিনই যদি তাকে হাসপাতালে নেয়া হতো, তাহলে সে এখন বাচ্চা কোলে সবার সাথে আনন্দ করতো। দুর্ভাগ্য, দূরত্ব আর সামাজিক গোঁড়ামির জন্য তারা সেটা করেননি। চেয়ে চেয়ে প্রিয় মানুষের মরণ দেখা ছাড়া, এখন আর কারোরই কিছু করার নেই।

দরজায় ধমাধম শব্দ হচ্ছে। আয়সার দাদী দরজা খুলে দিলো। তাকে পাশ কাটিয়ে তাড়াতাড়ি প্রসূতির রুমে ঢুকে গেল ফিরোজ। একজন ধাত্রী পাশ সরিয়ে আয়সার মাথার কাছে বসলো সে। এক হাত আয়সার ঘাড়ের পিছন দিক দিয়ে নিয়ে, মাথাটা উচু করল, তারপর বিসমিল্লাহ্‌ বলে আয়সার মুখে গ্লাসটা ধরল। ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে আয়সার মুখে পানি দিতে লাগলো। আয়সা একটু একটু করে পানি গিলছে। সে অনেকক্ষণ ধরেই পিপাসায় কাতর হয়ে ছিল। পিপাসায় গলা, বুক সব শুকিয়ে আছে তার। সে অচেতন তাই বলতে পারছিলনা -পানি খাবো। এখন মুখে পানির স্পর্শ পাওয়া মাত্রই তার অবচেতন মন তাকে পানি খেতে প্রলুব্ধ করছে। অর্ধেকের বেশি পানি আয়সাকে খাওয়ালো, বাকি পানিটুকু আয়সার পেটে মেখে দিলো ফিরোজ। প্রচণ্ড উত্তেজনায় তার শরীর কাঁপছে। কারো সাথে একটি কথাও না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো ফিরোজ। ঘরের দরজা আবার লাগিয়ে দিল ভিতরের মহিলারা।

ফিরোজ ওর মার ঘরে ঢুকলো। তার মা জায়নামাজে সেজদায় পরে আছেন। সেও মায়ের পাশে বসে, দুই হাত তুলে, আল্লাহ্‌র কাছে প্রাণ প্রিয় জীবন সঙ্গিনী আর অনাগত সন্তানের জন্য আকুল মিনতি জানাতে লাগলো। আল্লাহ্‌ সব পারেন। তিনি করুণাময়, অসীম দয়ালু। তিনি কি গ্রামের এই সহজ সরল মানুষগুলির করুণ আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারেন? তিনি এক গ্রাম মানুষের ব্যাথিত মুখগুলো মুহূর্তে হাসির বন্যায় ভাসিয়ে দিলেন।

পানির

হঠাৎ, সবার কান খাড়া হয়ে গেল? ফিরোজের ঘর হতে বাচ্চার কান্নার শব্দ ভেসে এল না? হ্যাঁ, তাইতো। ঐ ঘর থেকে একটা বাচ্চার জোরালো কান্নার শব্দ আসছে। সবাই একসাথে হই-হই করে উঠলো। খুশিতে সবাই একসাথে কথা বলতে চাইলো। ফলে, নীরব বাড়িটা মুহূর্তে গম-গম করে উঠলো। সবার দৃষ্টি ফিরোজের ঘরের বন্ধ দরজার দিকে। দরজা খুলে নবিরন খালা বেড়িয়ে এলেন। বুকের কাছে ধরে আছেন নতুন পাতনিতে জড়ানো একজন নবজাতক। তার মুখে হাসি যেন ধরেনা।

-এই যে আপনেরা সবাই শোনেন

নবিরন খালা উঁচু গলায় ঘোষণা করলেন

-আমাদের আয়সার, পরীর মত ফুটফুটে একটি কন্যা সন্তান হয়েছে। সবাই আল্লাহ্‌র দরবারে সুকরিয়া আদায় করুন।

সবাই একসাথে শুকুর আলহামদুল্লিলাহ বলে উঠলো। এবার তারা আয়সার খবর জানতে চায়। আয়সাও ঠিক আছে, জানায় নবিরন খালা। একটু আগের দুঃখী মুখগুলি খুশিতে ঝল-মলিয়ে উঠে। পাতনি সরিয়ে শিশুটিকে চাঁদের আলোয় মেলে ধরলেন নবিরন খালা। তার হাতের উপর নরম তুলতুলে পিচ্চি মানুষটি হাত-পা নাড়তে লাগলো, আর চাঁদের দিকে অবাক তাকিয়ে রইলো। ফিরোজ অবাক বিস্ময়ে শিশুটির দিকে তাকিয়ে আছে। আহা, কত কষ্ট করে এই পৃথিবীতে এসেছে আমার মানিকটা। ফিরোজের দু চোখ জলে ভরে উঠে। সে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেনা, ভুলে যায় এর আগে কোন দিন কারো ছোট্ট বাচ্চা সে কোলা নেয়নি। ধাত্রীর হাত থেকে আলতো করে মেয়েকে তুলে নেয় ফিরোজ। পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরে, বার বার কপালে চুমু খেতে থাকে।   সে নবিরন খালার সাথে প্রসূতির রুমে ঢুকে পরে। নবিরন আবার দরজা লাগিয়ে দেয়। আয়সার জ্ঞান ফিরেছে। সে তাকিয়ে আছে ফিরোজের দিকে। ফিরোজ আয়সার মুখের কাছে গিয়ে বসলো। কি অপরূপ মায়াময় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে আয়সা। সে দৃষ্টিতে, ভালবাসা, কৃতজ্ঞতাবোধ, অভিমান, লজ্জা, গর্ব আরো কত কিছু উপলব্ধি করে ফিরোজ। তার চোখ থেকে কান্না গড়িয়ে পরে আয়সার কপালে, গালে। সে এবার আস্তে করে মেয়েকে মার পাশে শুইয়ে দেয়। আয়সার একটা হাত নিজের হাতে তুলে নেয়, গভীর মমতায় বার বার চুমু খায়, হাতটাকে। কপালে, গালে গড়িয়ে পরা তারই চোখের জল এবং আয়সার চোখের জল, গভীর অনুরাগ, আর আদরের সাথে মুছে দিতে থাকে ফিরোজ। কঠিন বেদনার ছাপগুলি মুছে যাচ্ছে, আয়সার চোখ মুখ থেকে। সেখানে ফুটে উঠছে পরম প্রশান্তি আর নির্ভরতার ছাপ। ঘরের অভিজ্ঞ মহিলারা জানেন, স্বামীর এই হৃদয় উজাড় করা ভালবাসাই রোগীকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে তুলবে। তাদের সবার মুখেই ফুটে উঠেছে নির্মল হাসির ছোঁয়া……………।।

          S. Kabir