মমি শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন ছিল না, মানুষ এগুলো ব্যবহার করতো

মিশরের নাম শুনলে প্রথমে আমাদের মাথায় যে চিন্তা আসে তা হল মমি। মমির কথা শুনলে কেমন যেন একটা গাঁ শিরশিরে অনুভূতি হয়। মিশরের মমি দেখেছেন কখনো? আসল মমি দেখেছেন হয়তো কোন যাদুঘরে। কাল্পনিক মমি অবশ্যই দেখেছেন কোন চলচ্চিত্রে বা গল্পে। কিন্তু আপনি কি জানেন এই মমি দিয়ে কতো কিছু করছে মানুষ। ঔষধ বানানো থেকে শুরু করে ছবির রঙ বানাতেও ব্যবহৃত হয়েছে মমি।

১৭৯৮ সালে নোপলিয়ন মিশর আক্রমণ করে। বেশ কিছু পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ফলে ১৯ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে মিশরের মমির আজব সব ব্যবহার শুরু হয়। ১৮৩০ এর দিকে গুপ্তধনের খোঁজে বিত্তবান পশ্চিমা ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের ঢল ছোটে মিশরের মরুভূমিগুলোতে। এ নিয়ে তো অনেক গল্প, সিনেমাও তৈরি হয়েছে। এই গল্প আর সিনেমার কাহিনীগুলো কিছুটা বানানো হলেও সম্পূর্ণটা কিন্তু মিথ্যে নয়। তখন যদি কেউ মমি খুঁজে পেতেন, সেটা ছিল তার জন্য অত্যন্ত গর্বের এবং এ ঘটনাকে জীবনের অন্যতম বড় অর্জন বলে মনে করা হতো। ইউরোপীয়দের মমি উন্মাদনা এমন পর্যায়ে পোঁছে গিয়েছিল যে, কেউ মিশর থেকে ইউরোপে ফিরে যদি এক হাতে মমি আর অন্য হাতে কুমীর দেখাতে না পারতেন, তাহলে তাকে কেউ পাত্তাই দিতো না।

১৯ শতকে ইউরোপীয়রা কিভাবে মিশরের মমির ব্যবহার (আসলে অপব্যবহার করতো) করতো জানা যাক।

মমি দিয়ে রোগের ঔষধ তৈরি

মমি

ব্যপারটা অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু ১৯ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপীয়রা সুস্বাস্থ্যের জন্য একধরনের ক্যানিবলিজম অনুশীলন করতো। ঐতিহাসিক রিচার্ড সুগের মতে, ১৯ শতকের শেষের দিকে থেরাপিউটিক এজেন্ট হিসেবে মানব শরীরের ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতা ছিল। বেশিরভাগ জনপ্রিয় চিকিৎসায় মানব দেহের রক্ত, মাংস, হাড় এমন কি মাথার খুলিও ব্যবহার করা হত।

মমি, প্রায়ই “মামিয়া” (বিটুমিন আর মমির সংমিশ্রণে এক বিভ্রান্তিকর শব্দ) হিসেবে বিক্রি করা হত, এটি ত্বকে ব্যবহার করা হত। অথবা গুড়ো করে পানীয়তে মিশিয়ে ত্বকের কালশিটে দাগসহ অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অনেকেই মনে করতেন যে মমিতে আরোগ্য করার বিশেষ ক্ষমতা আছে। আবার অনেকে মনে করতেন যে মমিতে রক্ত চলাচল বাড়াতে বিশেষ গুণ রয়েছে। এই মমির ঔষধ এতো বেশী জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলো যে, এর চাহিদা মেটাতে দন্ডপ্রাপ্ত আসামী, দাস, ভিক্ষু এমন কি ঊটের লাশ থেকেও নকল মমি তৈরি করা শুরু হয়েছিল। এখন যেভাবে বাজারে ঔষুধ নকল করা হয় আরকি।

মমি পার্টির জৌলুস বাড়াত

মমি

কোন পার্টি বা গেট-টুগেদারের আসর জমানোর জন্য নতুন কিছু দরকার? যদি সেই পার্টিতে কোন মমি উন্মোচন করা হয় তবে ব্যপারটা কেমন হবে? ব্যপারটা এমন যে আপনার ড্রইং রুমে তুতেনখামুনের মমি রহস্য উন্মোচন করা হচ্ছে, পার্টিতে সবার মধ্যে এক শিহরণ খেলে যাচ্ছে। পার্টির জৌলুস বাড়াতে এমন ধরনের থীমের ব্যবহার তখনকার দিনের ইংরেজ জীবনে নতুন কোন ব্যপার ছিল না। বিশেষ করে যারা নিজেদেরকে একটু পন্ডিত মনে করতেন তারাই এমন সব থিমের আয়োজন করতেন।

মমি থেকে তৈরি রঞ্জক যখন চিত্রকরের রঙে

 

১৭ শতকের শুরুর দিকে, মমি ব্রাউন নামে এক ধরনের রঞ্জক পাওয়া যেত। মমি থেকে তৈরি এই রঞ্জক তখনকার ইউরোপীয় শিল্পীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। চিত্রশিল্পী দ্যলাক্রোয়া এটি ব্যবহার করতেন। এমনকি বৃটিশ শিল্পী স্যার উইলিয়াম বিচে ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে প্রাক-রাফায়েলীয়দের কাছে এটি বেশি পছন্দের ছিল। তবে বেশির ভাগ মানুষ অজান্তেই ব্যবহার করতো। কি দিয়ে তারা আকঁছে তা তারা জানতোই না।

মমি দিয়ে ঘরের স্মারক সাজানো হতো

মমি

১৯ শতকের বিত্তবান শ্রেণীর মধ্যে মিশর যাত্রা এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে অনেকে বাড়ীতেই ড্রইং রুমে স্মারক হিসেবে মমি রাখা হতো। অনেক সময় বেডরুমেও মমি রাখতো। অনেকে বাড়ির বিভিন্ন স্থানে মমির হাত, পা বা মাথার প্রদর্শনী করতো। বিশেষ করে বাড়ীর মেনটালপিছের উপরে কাঁচের ডোমের উপর সেগুলো দেখা যেত। অনেক সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও মমি প্রদর্শীত হতো। সিকগোর একটি ক্যান্ডি শপে ১৮৮৬ সালে একটি মিশরীয় মমি প্রদর্শন করে ক্রেতা আকৃষ্ট করা হতো। বলা হতো মমিটি ফেরাউনের মেয়ে মমি যিনি মূসাকে নলখাগরার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল। এগুলো ছিল আসলে লোক দেখানো বিষয়। মানুষকে ধাঁধাঁয় ফেলে দেয়াই ছিল এই উচ্চবিত্তদের কাজ।

কাগজ হিসেবে মমির ব্যবহার

মমি

কাগজ তৈরি নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তাদের কাছে এটি একটি বিতর্কের বিষয়। ১৯ শতকের মধ্যভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে কাগজের মিলগুলো মমি মোড়ানো কাপড়গুলো কাঁচামাল হিসেবে আমদানী করতো বলে মনে করে অনেক গবেষক। অনেকের মতে ১৯ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকায় মুদ্রিত জিনিসের বেশ ভাল চাহিদা দেখা যায়। গাছের পাল্পে কাগজ তৈরি শুরু হয় ১৮৫০ সালে যখন মমি কাগজের সল্পতা দেখা যায়। যদিও অনেকের মতে মমির সংখ্যা ছিল প্রচুর। তাই এ গল্পটি নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে।

মিশরের মমি দিয়ে সার তৈরি

মমি

দেব-দেবীদের প্রসন্ন লাভে লক্ষ লক্ষ জীবজন্তু প্রাচীন মিশরে মমি করা হয়েছিল। এতো জীবজন্তুর মমির ভিড়ে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছে বিড়ালের মমি। বিড়ালের মমির পরিমান এতো ছিল যে ১৯ শতকের শেষের দিকে ইংরেজ কোম্পানিগুলো কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য মিশর থেকে এগুলো কিনে নেয়। এক হিসেবে পাওয়া গেছে একটি কোম্পানী প্রায় ১৮,০০০ বিড়ালের মমি কিনেছিল। যার ওজন প্রায় ১৯ টন হবে। এগুলো দিয়ে সার তৈরী করা হয়েছিল এবং সাড়া ইংল্যান্ডে জমিতে তা ব্যবহার করা হয়েছিল। এই চালানের একটি বিড়াল খুলি এখনও ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ন্যাচারাল হিস্টরি ডিপার্টমেন্টে রক্ষিত আছে।

তহবিল গঠনে মমির পদর্শনী

মমি

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল প্রথম স্থান যেখানে আধুনিক অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবহারে প্রথম পাবলিক সার্জারি করা হয়েছিল। ১৮৪৬ সালে এই স্থানটি ইথার ডোম নামে একটি এম্পিথিয়েটার ছিল। কিন্তু এছাড়াও এ স্থানে আরেকজনের বসবাস ছিল যা কোন হসপিটালে থাকে না, তা হল একটি মিশরের মমি।

১৮২৩ সালে এই মমিটি ম্যাসাচুসেটস জেনারেলে উপহার হিসেবে আসে সিটি অব বোস্টন পক্ষ থেকে। ১৯ শতকের শুরু দিকে মমিটি মূলত কিনে আনেন একজন ডাচ ব্যবসায়ী, তিনি ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে এটা দেন হসপিটালের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে। হসপিটালের মতে, মমিটি দেখতে শত শত লোক জড়ো হয়েছিল, প্রত্যেকে তখন ০.২৫ ডলারের বিনিময়ে দেখেছিল আমেরিকায় প্রথম মানুষের সম্পূর্ণ মিশরীয় মমি। এরপরে বহুবার বহুস্থানে প্রদর্শনী করে হসপিটালের জন্য তহবিল সংগ্রহে ব্যবহার করা হয়েছে। মমিটি আজও সেই হসপিটালে অবস্থান করছে।